If you want to build a ship, don't drum up people to collect wood and don't assign them tasks and work, but rather teach them to long for the endless immensity of the sea.
Antoine de Saint-Exupéry

১ মানুষ প্রোগ্রামিং কেন করে?

জানো হুকুশ পাকুশ, মানুষের জীবনটা না খুব ছোট্ট। কিন্তু তারপরও না মানুষ অনেক বড় বড় জিনিস করতে চায়। মানুষ কবিতা লিখতে চায়, কাঠপেন্সিল দিয়ে ছবি আঁকতে চায়, চাঁদে গিয়ে চুপ করে বসে থাকতে চায়। তারপর আবার চাঁদ থেকে বালু নিয়ে বাড়িও ফিরতে চায়। তারপর যখন অনেক রাত হয় আর পুরো আকাশটা ঝিকিমিকি নীল তারাতে ভরে যায়, মানুষ চোখ বড় বড় করে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে আর একটা ছোট বাচ্চার মতো গালফোলা আগ্রহ নিয়ে বুঝতে চায় নীল তারাগুলোকে, আবছায়া ছায়াপথগুলোকে আর এই বিশাল মহাবিশ্বটাকে।

কিন্তু মহাবিশ্বটা না অনেক বেশি বড় আর চাঁদটা অনেক বেশি দূরে। সেজন্য চাঁদে যেতে হলে কিংবা মহাবিশ্বকে বুঝতে গেলে না অনেক হিসেব নিকেশ করতে হয়। ধরো তুমি তোমার রকেট নিয়ে চাঁদে যাচ্ছো আর মাঝপথে একটা বোকাসোকা উল্কার সাথে বাড়ি খেয়ে তোমার গতিপথ পাল্টে গেলো। তুমি তোমার ঠিক করা কক্ষপথ থেকে ছিটকে পড়ে বৃহষ্পতির দিকে রওনা দিলে আর কিছুতেই হিসেব করতে পারলে না কিভাবে তুমি চাঁদে গিয়ে পৌছবে। তারপর তুমি যদি সত্যি সত্যি বৃহষ্পতিতে চলে যাও - কি পঁচা হবে ভাবো! তুমি তোমার পৃথিবী থেকে কত্ত দূরে - আর কত্ত দূরে তোমার সব বন্ধুদের থেকে!

এধরণের হিসেব নিকেশগুলো অনেক বড় হয়। পাতার পর পাতা ফুরিয়ে যায়, পেন্সিলের পর পেন্সিল হাপিস হয়ে যায়, রাতের পর রাত কেটে যায়। সূর্যটা সকালবেলা এসে হাই তুলে চোখ ডলতে ডলতে জানালায় উঁকি মেরে দেখে মানুষটা তখনো হিসেব কষছে।

আরো সমস্যা হচ্ছে কি জানো, মানুষ প্রচচুর ভুল করে। তুমি খুব বিশ্বাস করে কাওকে তোমার কক্ষপথের হিসেব করতে দিলে, সে চুইঙগাম চাবাতে চাবাতে আনমনে একটা ইংরেজি আট (8) কে বাংলা চার (৪) বানিয়ে দিলো, আর সেই জন্য আধাপথে তোমার রকেটের তেল গেলো ফুরিয়ে!

১৮১২ তে চার্লস ব্যাবেজ ওর অফিসে বসে বসে এরকম হিসেব নিকেশ দেখছিলো আর ওর খুব মন খারাপ হয়ে যাচ্ছিলো ভুল দেখতে দেখতে। তারপর সে ভাবলো যদি মানুষগুলোকে যন্ত্রের মতো খাটতেই হয় এই হিসেব নিকেশগুলো করার জন্য, আমরা কেন একটা যন্ত্র বানাই না? কিন্তু সেটার কাজ শেষ হবার আগেই ব্রিটিশ সরকার ওর উপর আশা ছেড়ে দিয়ে কম্পিউটারের জন্য খরচ করা বন্ধ করে দিল। তারপরও চার্লস ব্যাবেজ ওর পুরো জীবনটা খরচ করলো ওর স্বপ্নটার পেছনে।

তারপর প্রায় একশ' বছর পর যখন বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলো জার্মানরা একটার পর একটা দেশ দখল করতে থাকলো ওদের প্রকান্ড সৈন্যবাহিনী নিয়ে। মিত্রবাহিনী দেখলো তারা কিছুতেই বুঝতে পারছে না এরপর জার্মানরা কি করবে। ওদের গোপন সংকেতগুলো ভাঙতে গেলে এত্ত বেশি হিসেব নিকেশ করতে হয় যে অনেক অনেক মানুষকে দিয়ে কাজ করালেও অনেকগুলো বছর লেগে যাবে সব সংকেতের মানে বের করতে। ততদিনে যুদ্ধ টুদ্ধ হেরে সবাই মরে ভূত হয়ে যাবে। তখন ব্রিটিশরা উঠে বসলো একটা যন্ত্র বানানোর জন্য যেটা জার্মানদের সংকেত ভাঙতে পারবে। তারপর একদিন অ্যালান টুরিঙ আর তার অষ্ট কুঠিরের দল একটা যন্ত্র সত্যি সত্যি বানালো - ঠিক যেরকম চার্লস ব্যাবেজ স্বপ্ন দেখেছিলো বানানোর বহু বহু বছর আগে। সেই যন্ত্রটাই ছিলো এখন তুমি যেই যন্ত্রতে আমার লেখাটা পড়ছো, তার পূর্বপুরুষ।

কম্পিউটার খুব দারুণ একটা যন্ত্র, যে অনেক অনেক হিসেব নিকেশ করতে পারে। আর বহু বহু কিছু করতে পারে যেগুলো ভাবতে গেলে তোমার মাথা ঘুরে যাবে। কিন্তু কম্পিউটার না কখনো কিচ্ছু করে না, সব সময় মন খারাপ করে বসে থাকে। তারপর ওর কানে ফিসফিস করে বলা লাগে যে তুমি এটা করতে পারো, তুমি ওটা করতে পারো। তখন কম্পিউটার খুব খুশি হয়ে ভালো ছেলের মতো সব কিছু করে ফেলে।

এই যে কম্পিউটারকে ফিসফিস করে বলে দেয়া লাগে কিসের পর কি করতে হবে, এটাকেই বলে প্রোগ্রামিং। তুমি যখন কম্পিউটারের সাথে কথা বলতে শিখে যাবে, তুমি যা বলবে কম্পিউটারটা ঠিক তাই করবে। তোমার নিজেকে মনে হবে এক মহা পরিক্রান্ত অশোক; তুমি বিশ্বযুদ্ধ না করেই সত্যি সত্যি একটা আস্ত পৃথিবী জয় করে নিয়েছো যারা তোমার কথায় ওঠে আর বসে।